আলুর দাম ও সংরক্ষণে দুঃশ্চিন্তায় চাষিরা

রাজশাহী ব্যুরো, ডাঃ মোঃ হাফিজুর রহমান:
বৃষ্টিতে কয়েকদিন ব্যাহত হলেও আবারো জোরেশোরে শুরু হয়েছে প্রান্তিক চাষিদের ক্ষেত থেকে আলু উত্তোলন। আলু তুলে সেই জমিতে বোরো ধান, পটলসহ অন্যান্য সবজি আবাদে নামবেন প্রান্তিক চাষিরা। তবে ব্যাবসায়ী কাম চাষিদের আলু তুলতে শুরু করেছে।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে জানা গেছে, জেলায় এবারে ৩৮ হাজার ৯৭১ হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হয়েছে।
আলু রাজশাহীর অর্থকরী ফসল। ধানের পরেই ব্যাপকভাবে আলুর আবাদ হয়ে থাকে এ জেলায়। এবছর লাভ হলে আগামী বছর লোকসান। লাভ লোকসানের দুরাচলের মধ্যে দিয়েই আশায় বুকবেধে আলুর আবাদ করে চলেছেন চাষিরা। গেলো কয়েক বছর ধরেই আলুতে লোকসান গুনছেন রাজশাহী অঞ্চলের আলু চাষি। আবারো বৃষ্টি হলে লোকসানের মুখে পড়বে চাষিরা। আলুর দাম ও সংরক্ষণ নিয়ে চাষিদের মাঝে হতাশা দেখা দিয়েছে। তারপরও বরেন্দ্রখ্যাত এই অঞ্চলে আলুচাষের পরিধি ও উৎপাদন বেড়েছে।
চাষিদের ভাষ্য, আলুতে যেমন ব্যাপক লাভ, তেমনি লোকসানের ধ্বসও কম নয়। আলুর আবাদে কারো কারো ভাগ্যে বৃহস্পতি দেখা দিলেও অনেকের ভাগ্যে জুটেছে মৃত্যু। বর্তমানে আলুর আবাদের উৎপাদন খরচ বেশী হওয়ায় এখন আর এই আবাদ প্রান্তিক চাষিদের নেই। এখন চাষি কাম ব্যবসায়ীরাই আলুর আবাদ করছেন। লাভ লোকসান মাথায় নিয়ে প্রতিবছরই লাভের আশায় চাষে নামছেন কৃষকরা।
সংশ্লিষ্ট কৃষি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বরেন্দ্র অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে আলুচাষ বেড়েছে। চাষি কাম ব্যবসায়ীরাই এই আবাদ করছেন। প্রান্তিক চাষিরাও ব্যবসায়ীদের জমি লীজ দিয়ে একদিকে নিশ্চিন্তে থাকছেন এবং অন্যদিকে আলু তোলার পর বোরো আবাদ করছেন। কেউ করছেন ভুট্টা চাষ। চাষে আধুনিক কলাকৌশল প্রয়োগে অধিক ফলন পাচ্ছেন চাষি। আবার আলুচাষে ব্যাপক জৈব সার ও রাসায়নিক সার প্রয়োগের ফলে পরবর্তী ফসল চাষে কমছে খরচ। আর এ কারণেই প্রান্তক চাষিরাও আলুর জমি লীজ দিয়ে লাভবান হচ্ছেন। এরপরেও যেসব চাষিরা লাভের আশায় আলুচাষ করছেন তারা প্রায় সকলই দামের ঝুকিতে থাকছেন।
এখন জেলার বিভিন্ন উপজেলাসহ বরেন্দ্রের মাঠে মাঠে আলুর ক্ষেত এখন একেবারে পরিপক্ক।ভয় করছে বৃষ্টি না হয় যেহেতু গতকয়েক দিন আগে বৃষ্টি হলে ফলে মাটি এখুনও কাদা থাকার কারণে আলুতে দাগ দেখা দিয়েছে।জমি শুকিয়ে গেছে আশা করা যায় এ সপ্তাহের মধ্যে আলু চাষিরা আলু তলে ফেলবে।তবে প্রান্তিক চাষিরা বোরো, ভুট্টা, পটলসহ অন্যান্য সবজি আবাদে নামবেন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে বাঁচতেই তাড়াতাড়িই ক্ষেত থেকে আলু তুলছেন। হিমাগারে রক্ষিত হচ্ছে এসব আলু। চাষি কাম ব্যবসায়ীরা আলু গুদামজাত করবেন। আর এ জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত করা হয়েছে হিমাগারগুলো।
জেলার মোহনপুর উপজেলার মৌগাছি ইউনিয়নের চাঁদপুর নপাড়া চাষি মোজাহার আলী ৬ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন। উৎপাদন ভাল হয়েছে। প্রতি বিঘা জমিতে ৮০ বস্তা (প্রতিবস্তা নূন্যতম ৬৫ কেজি) করে আলু পাচ্ছেন। তিনি বলেন, উৎপাদন ভাল হওয়ার পরেও বর্তমান দামে বিক্রি করলে লোকসান হবে।
নুড়িয়াক্ষেত্র এলাকার বাণিজ্যিক ভিত্তিতে আলু চাষ করেন মোবারক হোসেন। প্রায় ১৫ বছর ধরে বাণিজ্যিকভাবে আলুচাষ করছেন তিনি। এবারো ৫০ বিঘা জমিতে আলুচাষ করেছেন তিনি। এই চাষি জানান, প্রতিবিঘায় আলু উৎপাদন হয় প্রায় ৪ টন। সবমিলিয়ে উৎপাদন খরচ হয় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার। দুই বছর আগে আলুচাষ করে পুঁজি হারিয়েছেন তিনি। গত বছর উঠেছে উৎপাদন খরচ। এবার লাভের আশা দেখছেন তিনি। আলুতে যেমন ব্যাপক লাভ তেমনি ব্যাপক লোকসানও হয়। তবে তিনি বলেন, যারা বাণিজ্যিকভাবে আলু চাষ করেন তাদের উঠতি দাম কম-বেশিতে কিছু যায় আসেনা।
এদিকে, বাজারে এখন প্রতিকেজি আলু পাইকারী বিক্রি হচ্ছে ৭ টাকায়। গত দুই মাস ধরে উঠছে আগাম আলু। তবে পুরোদমে হিমাগারে আলু আসবে মার্চের মধ্যদিকে। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরেই ব্যাপক উৎপাদন হওয়ায় কোল্ডস্টোরে জায়গা হচ্ছেনা আলুর। ফলে মৌসুমের শুরুতে প্রান্তিক চাষিরা বাধ্য হচ্ছেন কম দামে আলু বিক্রি করতে। আর সুযোগটি নিচ্ছেন চাষি কাম ব্যবসায়ীরাই।
প্রান্তিক আলুচাষি মৌগাছি গ্রামের তোজাম শেখ, আলু এ অঞ্চলের অর্থকরী ফসল হলেও দামের ক্ষেত্রে সরকার কখনোই দৃষ্টি দেয় না। ফলে কৃষকেরা তেমন একটা দাম পাচ্ছেনা। কোন বছর লাভ হচ্ছে। আবার বেশী সময়ই কৃষককে লোকসান গুনতে হচ্ছে। যে কারণে প্রান্তিক চাষিদের মধ্যে আলুচাষে অনীহা দেখা দিচ্ছে। সরকার আগাম দাম দিলে প্রান্তিক চাষিরা ন্যায্যমূল্য পেত।
রাজশাহী জেলা হিমাগার মালিক সমিতির সভাপতি আলহাজ আবু বাক্কার আলী জানিয়েছেন, মোট উৎপাদিত আলুর প্রায় ৩০ শতাংশ সংরক্ষণ হয় হিমাগারে। জেলায় ২৮টা হিমাগারের প্রত্যেকটিতে গড়ে ১৫ হাজার টন করে প্রায় সোয়া ৪ লাখ টন আলু সংরক্ষণ করা যায় । দেড়শ থেকে ২০০ টাকায় প্রতিবস্তা (৬৫ কেজি) আলু সংরক্ষণ করেন চাষি।
রাষ্ট্রপতি পদকপ্রাপ্ত আলুচাষী জেলার পবা উপজেলার বড়গাছি এলাকার রহিমুদ্দিন সরকার বলেন, কয়েক বছর ধরেই রাজশাহীতে আলুচাষের অনুকূল আবহাওয়া বিরাজ করছে। তাছাড়া উন্নত মানের আলুবীজ ব্যবহার করছেন চাষিরা। আর এতেই বাম্পার ফলন মিলছে। তবে প্রক্রিয়াজাত ও সংরক্ষণের অভাবে আলুর নায্য দাম পাচ্ছেননা চাষিরা। তাছাড়া আলু রপ্তানীর উদ্যোগ নিলেও লোকসান কমতো কৃষকের।
বিষয়টি স্বীকার করে রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শামছুল হক বলেন, এই অঞ্চলের মাটি আলু চাষের উপযোগী। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা আধুনিক চাষের কলাকৌশল নিয়ে কৃষকদের পাশে রয়েছেন সবসময়।
তিনি আরো বলেন, আলুর ব্যাপক উৎপাদন হওয়ায় কৃষকের উৎপাদন খরচ উঠে যায়। ব্যাকৃষক লাভবান না হলেও লোকসান গুনতে হয়না। তাছাড়া আলু তোলার পর বোরো ও ভুট্টা চাষে খরচ কমে আসে। ফলে দিন দিন এই অঞ্চলে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে আলু চাষ।

Leave a Reply

Top