পদ্মা খনন করতে ভারতে প্র্রস্তাব

রাজশাহী ব্যুরো: রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বলেছেন, ‘‘আমার কাছে একটা প্রস্তাব আছে। ভারত রাজশাহী থেকে ঈশ্বরদী পর্যন্ত পদ্মা নদী ড্রেজিং করতে চায়। ইতিমধ্যে কথাবার্তা, সমীক্ষা ও যাচাই-বাছাই চলছে। আসছে মাসেই ভারতীয় প্রতিনিধি দল আসছে।’’ স্থানীয় একটি গণমাধ্যমে দেয়া সাক্ষাতকারে এ তথ্য জানান মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন।
তিনি বলেন, ‘‘পদ্মার ড্রেজিংটা হলে রাজশাহীতে একটা আন্তর্জাতিক নদী বন্দরও হতে পারে। শিল্পায়নটা তখন খুব সহজ হবে। এখানে আমি একটা ভূমিকা রাখতে চাই।’’
মেয়র খায়রুজ্জামান বলেন, ‘‘শিল্প-কারখানা করতে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে জায়গা দেয়া হচ্ছে না। আমাদের জায়গা আছে। ওরা আমাদের এখানে আসুক। আমরা জায়গা দেব। ভারতে উৎপাদন খরচ বেশি মনে হলে তারা আমাদের এখানে বিনিয়োগ করুক। আমরা উৎপাদন করে দেব। এই চেষ্টাটা আমাদের আছে। এটা সম্ভব। কারণ, ভারত থেকে আমাদের দূরত্ব বেশি না। আর নদী পথে যোগাযোগও সহজ।’’
রাজশাহীকে ঘিরে তার নানা উন্নয়ন-পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন মেয়র লিটন বলেন, ‘‘পিছিয়ে পড়া রাজশাহীকে এগিয়ে নিতে শিল্পায়নের বিকল্প নেই। তাই মনোযোগ এখন শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থানে। শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থানকে নিয়েই সবচেয়ে বেশি ভাবছি।’’
ভৌগলিক অবস্থানগত কারণে রাজশাহী অনেক পিছিয়ে গেছে। এখান থেকে বন্দরের দূরত্ব অনেক বেশি। যে কোনো কাঁচামাল আনা বা পণ্য পাঠানো ব্যয়বহুল। এছাড়াও নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারণে এখানে শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠেনি। কারণ রাজশাহীকে ঢাকার মতো করেই দেখা হয়েছে। আলাদা করে প্রণোদনা দেয়া হয়নি। ব্যাংকের সুদের হারটিও একই। এসব কারণে শিল্পায়ন হয়নি, কর্মসংস্থান হয়নি। এখন আমার মনোযোগ এসব জায়গায়।’’
মেয়র বলেন, ‘‘রাজশাহীতে শিল্পায়নের জন্য বড় সুযোগ হচ্ছে ভারত থেকে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানি। কারণ, রাজশাহীর সঙ্গে নৌ-পথে যোগাযোগ অত্যন্ত সহজ। আমরা পদ্মা ড্রেজিং করে খুব অল্প খরচে কাঁচামাল হিসেবে লোহা বা অন্যান্য সামগ্রী আনতে পারি। রেলপথ দিয়েও আনতে পারি। এখানে আমরা পণ্য তৈরি করে একই ভাবে আবার ভারতে রপ্তানি করতে পারি। এতে রাজশাহীতে অর্থনৈতিক প্রবাহ সৃষ্টি হবে। আমি এখানেই আপাতত বেশি জোর দিচ্ছি।’’
বাংলাদেশে ভারি শিল্পের ক্ষেত্রে চট্টগ্রাম এগিয়ে আছে। এর পরে হালকা বা মাঝারি শিল্পে এগিয়ে ঢাকা এবং তার পাশ্ববর্তী এলাকা। আমাদের রাজশাহীতে এগুলো কোনোটাই হয়নি। সরকারিভাবে যে কয়েকটি কারখানা ছিল হয় বন্ধ, না হয় ধুকে ধুকে চলছে। এগুলোকে আমি চলা বলি না। কৃষিনির্ভর অর্থনীতির কারণে এখানে পুঁজিও তৈরি হয়নি। আমাদের মাঝে ঘরমুখি ভাব রয়েছে। উর্বর জমির কারণে আমরা জমিতেই সময় দিয়েছি। এটা আমাদের জন্য ক্ষতির কারণ। সেই জায়গা থেকে এখন শিল্পায়নের কথাই ভাবতে হচ্ছে।’’
মেয়র লিটন বলেন, ‘‘রাজশাহীতে অর্থনৈতিক প্রবাহ তৈরিতে কার্যকরী ভূমিকা কেউ নেননি। চেম্বার অব কমার্সকে দেখেছি, যারা সভাপতিত্ব করতেন বা দায়িত্বে থাকতেন তারা দায়সারা ভাবেই মেয়াদটা পার করতেন। মনে হতো, সরকারি উন্নয়নমূলক কাজের ঠিকাদারী নেয়ার জন্যই তারা আসলে চেষ্টা করতেন। কেউ কেউ সরকারের নেক নজরে পড়ে প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী হয়েছেন, রাজশাহীর জন্য কিছুই করেননি। তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলে রাজশাহী এতোটা পিছিয়ে পড়তো না।’’
মেয়র বলেন, ‘‘২০০৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত আমি মেয়র হিসেবে দায়িত্বে থাকাকালে বিজিএমইএ-বিকেএমইকে একাধিকবার অনুরোধ করে তাদের রাজশাহীমুখি করার চেষ্টা করেছিলাম। ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দসহ আমি তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী, বাণিজ্য মন্ত্রী এবং অর্থমন্ত্রীকে রাজশাহীতে নিয়ে এসেছিলাম। তাদের দিয়ে রাজশাহীতে গার্মেন্ট শিল্পের ছোট ছোট পণ্য যেমন বোতাম, শার্টের কলার, প্যান্টের জিপার বা হাতের কার্ফ তৈরির কারখানার উদ্যোগ নিয়েছিলাম। তরুণরা তখন ১০-১৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেই এই কারখানাগুলি করতে পারতেন। এর পাশাপাশি বড় ব্যবসায়ী গ্রুপগুলোকে যাদের ৮ থেকে ১০টা গার্মেন্ট কারখানা আছে তাদের অন্তত একটা রাজশাহীতে করার জন্য অনুরোধ করেছিলাম।’’
মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, ‘‘পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে নিয়মই আছে যে রাজধানীতে কোনো কারখানা করতে হলে প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে আগে কারখানা করতে হবে। আমাদের দেশে এটা শুধু ব্যাংকের ক্ষেত্রে আছে। অন্যগুলোতে নেই। তাই যিনি ঢাকাতে কারখানা করছেন, সেখানে করেই যাচ্ছেন। রাজশাহীতে আসছেন না। দেশের সুষম উন্নয়নের জন্য এটা করা যাবে না। এক ডানা নিয়ে পাখি উড়তে পারে না। তাই যতবার সরকারের শীর্ষপর্যায়ে কথা বলছি, এই বিষয়গুলোই বলছি। রাজশাহীতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে ব্যবসায়ীদের জন্য যেন আলাদা প্রণোদনা দেয়া হয় সে দাবি করে আসছি।’’
রাজশাহীতে শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠার ব্যাপক সম্ভাবনা আছে উল্লেখ করে মেয়র লিটন বলেন, ‘‘রংপুর, নীলফামারিতে গার্মেন্ট কারখানা গড়ে উঠছে। রাজশাহী বা নাটোর, নওগাঁ কিংবা চাঁপাইনবাবগঞ্জে কেন হবে না? রাজশাহী বিমানবন্দরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে ছয় মাস বা এক বছর সময় লাগবে। এখন তো কাঁচ আর স্টিল দিয়ে আধুনিক, দেখার মতো অবকাঠামো হচ্ছে। বিমানবন্দরকে আধুনিক করতে চাই। আমার জানামতে বিমানবন্দরের রানওয়ে ৬ হাজার ফুট লম্বা করলে এখানে বড় যাত্রীবাহী বিমান ও পণ্যবহনকারী কার্গো বিমান ওঠানামা করতে পারবে। এটি করতে আমার সর্বাত্মক চেষ্টা থাকবে। এটি হলে রাজশাহীতে শিল্প-কারখানা যেমন গড়ে উঠবে তেমনি রাজশাহীর টাটকা সবজি দেশের বাইরে পাঠানো যাবে।’’
মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, ‘‘এখন সময় এসেছে রাজশাহীর মানুষের ঘুরে দাঁড়ানোর। শিক্ষিত জনগোষ্ঠির একটা বড় অংশ এখনও কর্মহীন হয়ে আছে। তাদের চাকরির পেছনে না ছুটে আত্মকর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। সরকার এলএনজি গ্যাস আমদানি করছে। এই গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে সারাদেশে পৌঁছাবে এবং এর মাধ্যমে রাজশাহীতে শিল্পায়নের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।’’
বিসিককে ‘অকার্যকর’ উল্লেখ করে মেয়র বলেন, ‘‘এখানে কার্যকরী কোনো কল-কারখানা নেই। তাই রাজশাহীতে আরেকটি নতুন বিসিক করার জন্য সরকার অনুমোদন দিয়েছে। এটি বিসিক ফেজ-২। এখানে গার্মেন্ট কারখানাগুলি করার জন্য আমি ইতিমধ্যেই কথা বলছি। এটি আমরা শুধু গার্মেন্ট এবং তার প্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য সংরক্ষিত রাখতে চাই। এখানে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন বোর্ডও ১০০ একর জায়গায় আরেকটি শিল্পাঞ্চল করছে।’’
মেয়র লিটন বলেন, ‘‘আমি গতবারের মতো এখনও শিল্প-উদ্যোক্তাদের এখানে আসতে উদ্বুদ্ধ করতে, ব্যাংক সুদের হার কমিয়ে আনতে কাজ করব। এ জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে যারা আছেন তাদের সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। আমি সবার সহযোগিতা চাই। শিল্পায়নের মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে রাজশাহীকে এগিয়ে নিতে চাই।’’ সূত্র- সোনালী সংবাদ

Leave a Reply

Top