সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় এসআই বরখাস্ত

রাজশাহী ব্যুরো, মোঃ হাফিজুর রহমান:
রাজশাহীতে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় এক এসআই বরখাস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয় বলে জানিয়েছেন জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও জ্যেষ্ঠ সহকারি পুলিশ সুপার আব্দুর রাজ্জাক খান।
বরখাস্ত হওয়া ওই এসআইয়ের নাম তৌফিক পারভেজ। তিনি রাজশাহীর পুঠিয়া থানায় কর্মরত ছিলেন। সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনার পর তাকে ওই থানায় সংযুক্ত রেখে জঙ্গল প্রশিক্ষনের জন্য রাঙ্গামাটি বদলি করা হয়।
সহকারি পুলিশ সুপার আব্দুর রাজ্জাক খান বলেন, ‘‘এসআই পারভেজের বিরুদ্ধে সাংবাদিক নির্যাতন, কর্মকর্তাদের নিয়ে অশালিন মন্তব্যসহ বেশকিছু অভিযোগ উঠে। এছাড়াও তাকে জঙ্গল প্রশিক্ষনের জন্য রাঙ্গামাটি বদলি করা হলেও তিনি সেখানে যোগদান করেননি। বিষয়গুলো নিয়ে তিনটি পর্যায় থেকে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত করা হয়। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় গত রোববার তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দেয়া হয়েছে।’’
উল্লেখ্য, গত ২ জানুয়ারি রাত ১০ টার দিকে পুঠিয়া উপজেলার বানেশে^র ট্রাফিক মোড়ে এশিয়ান টেলিভিশনের রাজশাহী প্রতিনিধি মুরাদুল ইসলাম সনেটকে ধরে ব্যাপক শারীরিক নির্যাতন ও অশ্লিল ভাষায় গালাগালি করে এসআই তৌফিক পারভেজ। এ সময় তিনি নিজেকে আওয়ামী লীগের একজন কেন্দ্রীয় নেতার ভাতিজা পরিচয় দিয়ে মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও রাজশাহীর পুলিশ সুপারকে নিয়েও অশালিন মন্তব্য করেন। ঘটনার মাস খানেক পর এসআই পারভোজের সাংবাদিক নির্যাতনের একটি অডিও প্রকাশ হয়। ওই অডিও রেকর্ডে হেরোইনসহ এক মাদক ব্যবসায়ীকে ধরে ২৫ হাজার টাকা নিয়ে ছেড়ে দেয়ার তথ্য মিলে।
এসআই পারভেজের যত অপকর্ম এসআই তৌফিক পারভেজ পুঠিয়া থানায় কর্মরত হলেও সে পরিবার নিয়ে বসবাস করে চারঘাট উপজেলা সদরে। ফলে তার অপকর্ম বিস্তৃত এ দুই থানা নিয়ে। নির্ধারিত একটি সিএনজি নিয়ে তিনি চারঘাটে যাতায়াত করেন। ২০১৪ সালে তিনি চারঘাট থানায় কর্মরত ছিলেন।
পুলিশ ও বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের প্রকাশিত খবর সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালে থানায় মাতলামি ও পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে অশালিন আচরণ করাসহ নানা অপকর্মের অভিযোগে সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ থানা থেকে এসআই তৌফিক পারভেজকে প্রত্যাহার করা হয়। এর পর ২০১৪ সালে তিনি বদলি হন চারঘাট থানায়।
২০১৪ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর উপজেলার হলিদাগাছিতে গ্রামে অস্ত্র ব্যবসায়ীকে প্রকাশ্যে মোটা অংকের অর্থ নিয়ে ছেড়ে দেয়ায় এসআই তৌফিক পারভেজকে গণধোলাই দিয়ে আটকে রাখে এলাকাবাসী। পরে পুলিশের কর্মকর্তারা গিয়ে তাকে উদ্ধার করে। এর দুইমাস পর তৎকালিন জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের সঙ্গে অশালিন আচরণ করায় ক্লোজ হন এসআই পারভেজ।
এর পর তিনি চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল থানায় বদলি হন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোল থানায় থানায় কর্মরত অবস্থায় ২০১৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি দুই শিশু অপহরণকারিকে ধরে মোটা অর্থের বিনিময়ে ছেড়ে দেয়ার অভিাযোগে ক্লোজড হন এসআই তৌফিক পারভেজ।
২০১৭ সালে শেষের দিকে তিনি বদলি হয়ে যান রাজশাহীর দুর্গাপুর থানা। সেখানে কর্মরত অবস্থায় গত বছরের ৬ মার্চ পুলিশের কাছ থেকে পালাতক চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীকে ধরে মোটা অংকের অর্থ নিয়ে ছেড়ে দেয় এসআই তৌফিক পারভেজ। এ ঘটনায় এসআই পারভেজকে ক্লোজড করা হয়। পরে তাকে পিবিআইতে বদলি করা হয়। সেখান থেকে তদবির করে বদলি নেন বাগমারা থানায়। সেখানে পুলিশের সঙ্গে অশালিন আচরণ করায় যোগদানের সাতদিন পর তাকে বদলি করা হয় পুঠিয়া থানায়।
পুঠিয়া থানায় যোগদানের পর বেড়ে যায় তার অপকর্ম। যার বিস্তার ঘটে পুঠিয়া ও চারঘাট থানা জুড়ে। সর্বশেষ গত ১১ জানুয়ারি রাজশাহী শহর থেকে দুই তরুণ-তরুণী বেড়াতে গিয়েছিলেন পুঠিয়ায় বানেশ^র এলাকায় মহাসড়কের পাশে একটি চায়ের দোকানে চান পান করেন তারা। এর পর তারা দুইজনে ধুমপান করেন। ধুমপান করার অপরাধে তাদের দুজনকে ধরে নিয়ে যায় এসআই তৌফিক পারভেজ। পরে তিনি ওই তরুণ-তরুণীর কাছে ৫০ হাজার
টাকা দাবি করে বিকাশে পাঠাতে বলে। সে টাকা না দিয়ে রাতভর ওই তরুণ-তরুণীকে থানা হাজতে রেখে দেয়। তবে পরের দিন সকালে তরুণীকে ছেড়ে দেয়া হলেও মাদক সেবনের মামলায় ওই তরুণকে জেল হাজতে পাঠিয়ে দেয় এসআই পারভেজ।
এর আগে গত ৪ জানুয়ারি বিকেলে নাটোর থেকে পুঠিয়া বেড়াতে আসা একজন সাংবাদিকসহ চার যুবককে তল্লাশী ও জিজ্ঞাবাসাদের নামে এসআই পারভেজ তাদের ধরে নিয়ে যায় একটি নির্জন এলাকার একটি বাগানে। সেখানে গাছের ডাল দিয়ে তাদের বেধরক পেটায় এসআই পারভেজ। মারপিটের পর তাদের মাথায় অস্ত্র ধরে ভয় দেখিয়ে ৮০ হাজার টাকা দাবি করে। টাকা না দিলে পকেটে ইয়াবা দিয়ে তাদের চালান দেয়ার হুমকি দেয়। ফলে বাধ্য হয়ে টাকা দিতে রাজি হয়। বিকাশের মাধ্যমে পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে ৬৫ হাজার টাকা দিয়ে এসআই পারভেজের কাছ থেকে মুক্তি পায়।
আর আগে গত ২ জানুয়ারি রাত সাড়ে ১০টার দিকে বানেশ^র ট্রাফিক মোড়ে চার যুবকের সঙ্গে অশালিন আচরণ করেন এসআই তৌফিক পারভেজ। এ সময় ঘটনাটি মোবাইল ফোনে রেকর্ড দেয় এশিয়ান টেলিভিশনের রাজশাহী প্রতিনিধি। পরে তাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে ধরে নিয়ে যায় একটি নির্জন এলাকায়। সেখানে তাদের বেধরক মারপিট করে গভীর রাত পর্যন্ত বেধে রাখে। রাত ২টার দিকে তাদের নিয়ে যায় পুঠিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখানে তাদের কোন পরীক্ষা ছাড়াও শরীরে এ্যালকাহল আছে বলে চিকিৎসকের কাছ থেকে সনদপত্র নেয়। এর পর মাদক সেবনকারি হিসেবে মামলা দিয়ে তাদের জেল হাজতে পাঠায় এসআই তৌফিক পারভেজ।

Leave a Reply

Top