হারিয়ে যাচ্ছে বাউফলের ‘সোনাইমুখী’

দেশি মুগডাল ,বগুরা মুগডাল যে নামেই ডাকেনা কেন, মুলত এই ডালটির নাম সোনাইমূখী ডাল। পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার প্রান্তীক কৃষকের হাতে চাষ হওয়া এই সুগন্ধীমাখা সোনাইমূখী ডালের সু-খ্যাতী রয়েছে দেশ জুড়ে।

ভোজনপ্রিয় বাঙ্গালীর বিশেষ দিনের বিশেষ খাবারের তালিকায় এখনও থাকে এ ডাল। তবে আশাহতের বিষয় হল উচ্চফলনশীল (হাইব্রিড) জাতের কারণে সুগন্ধীমাখা বিখ্যাত সোনামূখী মুগডাল হাড়িয়ে যাচ্ছে এ উপজেলা থেকে। অধিক ফলন পাওয়ার আশায় কৃষকরা এখন সোনামূখী মুগডালের পরিবর্তে উচ্চফলনশীল মুগডাল চাষে ঝুঁকে পরছেন। এখন যা চাষ হচ্ছে তা প্রায় বিচ্ছিন্ন ভাবে।

বাউফল কৃষি সম্প্রসারন কর্মকর্তা আরাফাত হোসেন জানান, চলতি বছর উপজেলায় ১৯ হাজার হেক্টর জমিতে উচ্চ ফলনশীল মুগডাল চাষের লক্ষ্যমাত্র নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু চাষ হয়েছে ১৬হাজার ৫০০হেক্টর জমি। প্রতি হেক্টরে এক মেট্রিক টন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করা হলেও আবহাওয়া অনুকুলে থাকার কারণে উৎপাদন হয়েছে ১.২ মেট্রিক টন। ফলে লক্ষ্যমাত্রার থেকে উৎপাদন বেশি হয়েছে।

লক্ষমাত্রার চেয়ে কেন এ বছর মুগডাল চাষ কম হয়েছে, এমন প্রশ্নের উত্তরে ওই কর্মকর্তা বলেন, গত বছর তুলনায় তিনগুন বেশি বোরোধান আবাদ হওয়ায় মুগডাল চাষ কম হয়েছে। তবে তিনি জানিয়েছেন, মুগডাল কম জমিতে চাষ হলেও উৎপাদন বাম্পার হওয়ায় লক্ষমাত্রা পূরণ হবে।

তবে উপজেলা কৃষি অফিসে দেশিও প্রজাতীর সোনাইমূখী ডাল চাষ হয়েছে কিনা এমন কোন তথ্য নেই।

স্থানীয় কৃষকদের কাছে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কৃষকরা এখন আর দেশিও প্রজাতীর সোনাইমুখী মুগডালের চাষ করতে আগ্রহী হচ্ছেন না। কারন উচ্চফলনশীল (হাইব্রিড) জাতের মুগডাল চাষ করলে অধিক ফলন পাওয়া যায়। অন্যদিকে দেশিও প্রজাতীর ডাল বানিজ্যিক ভাবে খুব একটা চাষ না হলেও কিছু কিছু কৃষক বিচ্ছিন্ন ভাবে সোনাইমুখী ডাল চাষ করছেন। দক্ষিনাঞ্চলের বৃহত্তর ডালের বাজার উপজেলার বানিজ্যিক রাজধানী কালাইয়া বন্দরে একাধিক পাইকারী আড়তদারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমান উচ্চফলনশীল জাতের মুগ ডাল প্রতি মন (৪৮ কেজি) আঠারশ থেকে দুই হাজার টাকা। অপর দিকে সোনাইমুখী মুগডালের প্রতি মন ২৫০০ টাকা।

বাউফল পৌরশহরের বাসিন্দা ও উপজেলা পৌড় ক্লাবের সিনিয়র উপদেষ্টা জীবন কৃষ্ণ কর্মকার বলেন, এক সময় সোনাইমুখী মুগডাল দেশজুরে খ্যাতী ছিল। এখন কালের আর্বতনে তার হাড়িয়ে যাচ্ছে। আগের মতন এখন আর পাওয়া যায়না এ ডাল। এ ডাল কিনতে হলে স্থানীয় আড়তদারদের কাছে অগ্রিম অর্ডার দিয়ে রাখতে হয়। যা পাওয়া যায় তাও চাহিদার তুলনায় কম। উচ্চফলনশীল মুগ ডালের চেয়ে দেশীও সোনাইমুখী ডাল অপেক্ষাকৃত সাইজ অনেক ছোট। ডালের রং সবুজের মধ্যে সোনালী আভা।

কালাইয়া বন্দরের শতবর্ষী গৃহিনী রাজলক্ষী সাহা বলেন, সু-স্বাদু ও সু-গন্ধি সোনাইমুখী ডাল পিঠাপুলি, খিচুরীসহ নানা উপকরণে রান্না করা যায়। ভাজা সোনাইমুখী ডালের মধ্যে ইলিশ মাছের কাটা দিয়ে রান্না করলে যে কোন ভোজন প্রীয় মানুষ লোভ সামলাতে পারবেন না। এ ছাড়াও সোনাইমুখী ডাল ভেজে গুরা করে হরেক প্রকার পিঠা তৈরী করলে গন্ধে ও স্বাদে অতুলনীয় লাগে। দুরের আত্মীয় স্বজনরা প্রতিবছর এ সময়টায় অপেক্ষায় থাকে সোনাইমুখী ডাল উপহার পাওয়ার জন্য।

গৃহীনি রাজলক্ষী সাহার দাবী, সরকার যেন সোনাইমুখী ডালটি সংরক্ষন করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

উপজেলা কৃষিকর্মকর্তা অপূর্ব লাল সরকার বলেন, দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে বেড়ে যায় মানুষের সামগ্রীক চাহিদা। এই চাহিদা পূরণের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগ উচ্চফলনশীল (হাইব্রিড) চাষাবাদের জন্য কৃষকদের উদ্ধুদ্ধ করে থাকে। কারন পুরনো পদ্ধতী ও দেশিও বীজ দিয়ে চাষাবাদ করলে দেশের প্রয়োজনয়ি চাহিদা মিটানো যাবে না। তবে যাতে সোনাইমুখীর ডালের মতন এ ধরনের শষ্য যাতে হারিয়ে না যায় সে জন্য কৃষি বিভাগ সচেষ্ট আছে।

চৈত্রের দ্বিতীয় পক্ষ থেকে জৈষ্ঠ্যের প্রথম পক্ষ পর্যন্ত মুগডাল তোলা হয়। কালাইয়া বন্দরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আশা পাইকারদের কাছে বিক্রি করতে স্থানীয়সহ আশপাশের উপজেলায় উৎপাদিত হাজার হাজার টন মুগডাল নিয়ে কুষকরা প্রতি হাটের দিন হাজির হন। পাইকাররা স্থানীয় আরৎদারদের মাধ্যমে ওই ডাল ক্রয় করে থাকেন। কৃষকরা জানান, বৈশাখের  দ্বিতীয় সপ্তাহে প্রতি মণ (স্থানীয়ভাবে ৪৮ কেজি) মুগডাল ২ হাজার ৩০০ শত টাকা থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা ছিল। কিন্তু স্থানীয় আরৎদারদের সিন্ডিকেটের কারণে বর্তমানে প্রতি মণ মুগডালের দাম ২ হাজার থেকে ২ হাজার ১০০ টাকায় নেমে এসেছে। ফলে কৃষকরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অপরদিকে আরৎদাররা জানিয়েছেন, সার্বিকভাবে মুগডালের চাহিদা আগের থেকে কম। কিন্তু আমদানি বেশি। ফলে পাইকাররা মুগডাল ক্রয়ে তেমন আগ্রহী নন। এদিকে আরৎদাররা ক্রেতা ও বিক্রেতাদের থেকে আরৎদারি নিয়ে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছেন। কৃষকরা জানান, আরৎদাররা প্রতি কেজিতে বিক্রেতার থেকে ৫০ পয়সা এবং ক্রেতার কাছ থেকে ৫০ পয়সা আরৎদারি নেন। ফলে প্রতিমণ ডালে তারা ৪৮ টাকা আরৎদারি নিচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় আরৎদাররা পাইকারদের থেকে অগ্রিম টাকা আনার সুযোগ গ্রহণ করায় কৃষকদের স্বার্থের পরিবর্তে পাইকারদের স্বার্থে সিন্ডিকেট করে ডালের দাম নিয়ন্ত্রণ করছেন। যদিও এযুক্তি আরৎদাররা মানতে রাজি নন। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সরোয়ার জামান জানান, সরকারি সহায়তায় কৃষক পর্যায়ে ডাল সংরক্ষণ করাতে পারলে তারা যথাসম্ভব উপকৃত হতো।

Leave a Reply

Top