তুমুল বিরোধিতার মুখে তিতাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব

গ্রাহক পর্যায়ে গ্যাসের দাম বাড়াতে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানির প্রস্তাবে বিরোধিতা করেছেন বিভিন্ন স্টেক হোল্ডাররা। একইসঙ্গে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি কোম্পানিটির প্রস্তাবে শ্রেনীভিত্তিক গ্যাস ক্রয়-বিক্রয়ের পরিমাণ, সরবরাহ করার বিপরীতে আদায় করা ভ্যাটের পরিমাণ, শ্রেণিভিত্তিক রাজস্বের পরিমাণ অলাদাভাবে উপস্থাপন করার জন্য আবশ্যক বলে মতামত দিয়েছে। এছাড়া গ্যাসের তাপন মূল্যও পৃথকভাবে উপস্থাপনের পক্ষে মতামত দিয়েছেন।

মঙ্গলবার (১২ জুন) রাজধানীর কারওয়ান বাজারের টিসিবি ভবনে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) গ্যাসের মূল্যহার পরিবর্তন আবেদনের ওপর গণশুনানীর দ্বিতীয় দিনে  বৃহৎ এ বিতরণ কোম্পানিটি সার উৎপাদনে সর্বোচ্চ ৩৭২ শতাংশ দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করে। তিতাসের দেয়া প্রস্তাব অনুযায়ী, বর্তমানে সার উৎপাদনে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম রয়েছে ২ দশমিক ৭১ টাকা। তিতাস ১২ দশমিক ৮০ টাকা করার প্রস্তাব দিয়েছে।

এরপরেই বিদ্যুতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দর বাড়ার প্রস্তাব করা হয়েছে । প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের বর্তমান দর ৩ দশমিক ১৬ টাকা বাড়িয়ে ১০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ক্যাপটিভ পাওয়ারে ৯ দশমিক ৬২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৬ টাকা, শিল্পে ৭ দশমিক ৭৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫ টাকা এবং সিএনজির দর ৩২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। আবাসিকে গ্যাসের দাম বাড়ার কোনো প্রস্তাবনা দেয়নি তিতাস গ্যাস।

কমিশনের চেয়ারম্যান মনোয়ার ইসলাম, সদস্য আব্দুল আজিজ খান, মিজানুর রহমান, রহমান মুর্শেদ, মাহমুদউল হক ভূঁইয়া শুনানি গ্রহণ করছেন। ক্যাবের জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম, জিটিসিএল, পিডিবিসহ বিভিন্ন কোম্পানির কর্মকর্তা ও ভোক্তারা উপস্থিত ছিলেন।

শুনানীতে অংশ নিয়ে কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম তার সংস্থার পক্ষ থেকে ২৯ দফা প্রশ্ন উত্থাপন করেন। এক প্রশ্নে বলা হয় লাইনে এখনো এলএনজি আসেনি। ফলে এলএনজি মিশ্রিত গ্যাসের মূল্যহার বাড়াসহ সঞ্চালন ও বিতরণ চার্জবৃদ্ধির প্রস্তাব আইনী বিধান মতে আমল অযোগ্য। তাই এ সব প্রস্তাবের ওপর গণশুনানী করা বিইআরসির এখতিয়ার বহির্ভূত। এসময় বিতরণ চার্জ বাড়ার ওই প্রস্তাবকে প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক নুরুল ইসলাম বিইআরসির কারিগরি কমিটি সংস্কারের প্রস্তাব জানিয়ে বলেন, তিতাস দেশের প্রায় ৪০ ভাগ গ্যাস বিতরণ করে। অথচ তাদের লাইনে অনেক সমস্যা। লাইনে ত্রুটির কারণে বিভিন্ন সময় দুর্ঘটনা ঘটে। অথচ এ যাবতকালে তারা কাউকে সহায়তা করেছে বলে আমার জানা নেই।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বদরুল ইমাম বলেন, মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তির পর গ্যাস আহরণে কোনো অগ্রগতি ঘটেনি। অথচ সেখানে গ্যাসের অফুরন্ত সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু কোন এক অজ্ঞাত কারণে সেদিকে না গিয়ে গ্যাস আমদানির দিকে ঝুঁকছে। এটি আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত।

স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন জানান, ২০১৪ সালে একটি কারখানার জন্য ডিমান্ড নোট পাওয়ার পরও এতোদিনের তিতাস গ্যাস সংযোগ দেয়নি। এটি জালিয়াতি। তিনি বলেন, আমার সঙ্গে এমন জালিয়াতি করা হলে দেশের সাধারণ মানুষের অবস্থা যে কত ভয়াবহ তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

এজন্য আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার কথা জানান ওই শুনানিতে।

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েত সাকী বলেন, প্রতি বছর একটি আনুষ্ঠানিক শুনানি হলেও শুনানিতে আসা মতের বিরুদ্ধে গিয়ে প্রতিবারই গ্যাসের দাম বাড়ে। যে কারণে রেগুলেটরি কমিশনের প্রতি মানুষের আস্থার সঙ্কট তৈরি হয়েছে। তার মতে একটি মুনাফা লোভী শ্রেণির জন্য দেশের এলএনজির প্রয়োজন না থাকলেও তা আমদানী করা হচ্ছে। জ্বালানি খাতে তুমুল অব্যবস্থাপনা এবং মুনাফার দ্বন্দ্ব চলছে বলেও মন্তব্য করেন সাকী।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমইএ) প্রতিনিধি শাহিদ আলম বলেন, তিতাস একটি সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এখন তারা শেয়ার বাজারেও বন্ড দেয়। শেয়ার বাজারকে চাঙ্গা রাখার কাজ তিতাসের নয়। তারা এখন প্রতি বছর মুনাফাখোর বেনিয়া প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

বিইআরসির কারিগরি কমিটির মূল্যায়ন প্রস্তাবে বলা হয়, বিদ্যুৎ গ্রাহক শ্রেণির মধ্যে ক্যাপটিক গ্রাহককে অন্তর্ভুক্ত করে গ্যাস বিক্রির পরিমাণ ঠিক করতে  ট্যারিফ শ্রেণি অনুযায়ি গ্যাস বিক্রয়ের পরিমাণ ও রাজস্ব নিরুপণ আবশ্যক। সেইসঙ্গে বার্ষিক নীরিক্ষা হিসাব প্রতিবেদনে গ্রাহক শ্রেণি ভিত্তিক গ্যাস ক্রয় বিক্রয়ের পরিমাণ গ্যাসের তাপন মূল্য পৃথকভাবে উপস্থাপণ করা আবশ্যক। মূল্যায়ন প্রস্তাবে আরও বলা হয়, গৃহস্থালি শ্রেণিতে মিটার যুক্ত ও মিটারবিহীন গ্রাহকের গ্যাসের ব্যবহারের পরিমাণ এবং প্রাপ্ত রাজস্বের পরিমাণ আলাদাভাবে উপস্থাপন করা আবশ্যক।

Leave a Reply

Top